পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের হকার উচ্ছেদ: ভালো দিক ও খারাপ দিক

নিজস্ব প্রতিবেদন : ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত, রেলজমি ও অন্যান্য সরকারি জায়গা থেকে অবৈধ দখল এবং অনুমতিহীন হকারি সরানোর অভিযান শুরু হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা দখলমুক্ত করা, যানজট কমানো এবং শহরকে আরও পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত করে তোলাই এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। অন্যদিকে, হকারদের একাংশ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন অভিযোগ করেছে, পুনর্বাসনের যথেষ্ট ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ করা হলে বহু মানুষের জীবিকা বিপন্ন হতে পারে।

উচ্ছেদের পক্ষে যুক্তি

প্রথমত, ফুটপাত মূলত পথচারীদের চলাচলের জন্য তৈরি। বহু জায়গায় দোকান বা অস্থায়ী স্টল ফুটপাতের বড় অংশ দখল করে রাখায় পথচারীদের রাস্তার উপর দিয়ে হাঁটতে হয়। ফলে দুর্ঘটনা ও যানজটের ঝুঁকি বাড়ে। কলকাতা হাইকোর্টের একটি মামলার নথিতেও দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে দখল সরানোর কারণ হিসেবে পথচারী ও যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচলে বাধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, পরিকল্পিতভাবে হকারি নিয়ন্ত্রণ করা হলে শহরের সৌন্দর্য ও নাগরিক পরিষেবা উন্নত হতে পারে। ২০২৬ সালে Park Street-সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফুটপাত পরিষ্কার ও পুনর্গঠনের পরিকল্পনার কথাও সরকার জানিয়েছে।

তৃতীয়ত, অনুমতিহীন দখল বন্ধ হলে একই জায়গায় ব্যবসা করা বৈধ দোকানদার এবং পথচারীদের মধ্যে জায়গা নিয়ে সংঘাত কমতে পারে। বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্রগুলিকে আরও সংগঠিত করার সুযোগও তৈরি হয়। কলকাতা পুরসভা ২০২৬ সালে পুরসভার বাজারগুলিকে দখলমুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।


উচ্ছেদের বিপক্ষে যুক্তি

তবে এই অভিযানের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল হকারদের জীবিকা। বহু মানুষ বছরের পর বছর হকারি করে পরিবার চালান। কলকাতা ও তার আশপাশে এমন বহু হকার রয়েছেন যাদের পরিবারের একমাত্র বা প্রধান আয়ের উৎস এই ছোট ব্যবসা। উচ্ছেদের ফলে তাঁদের হঠাৎ আয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ২০২৬ সালের অভিযানে Dum Dum ও Sealdah-সহ বিভিন্ন এলাকায় হকারদের জীবিকা নিয়ে উদ্বেগের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, শুধু উচ্ছেদ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। অতীতের কলকাতার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বিকল্প জায়গা যদি ক্রেতাশূন্য বা ব্যবসার পক্ষে অনুপযুক্ত হয়, তাহলে উচ্ছেদ হওয়া হকাররা আবার পুরনো জায়গায় ফিরে আসতে পারেন। ১৯৯৬ সালের Operation Sunshine-এর পরেও এমন পরিস্থিতির নজির রয়েছে।

তৃতীয়ত, হকারদের অধিকারও আইন দ্বারা সুরক্ষিত। Street Vendors (Protection of Livelihood and Regulation of Street Vending) Act, 2014 অনুযায়ী হকারদের উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা রয়েছে। সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, জরুরি জনস্বার্থ ছাড়া relocation এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন হলে এমনভাবে পুনর্বাসন করা উচিত যাতে হকারদের জীবিকা অন্তত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়।

২০২৬ সালে কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের হওয়া একটি PIL-এও অভিযোগ করা হয়েছে যে আইনসম্মত survey, vending certificate, Town Vending Committee এবং rehabilitation-এর মতো সুরক্ষা নিশ্চিত না করে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা উচিত নয়।

কী হতে পারে সমাধান?

শহরকে দখলমুক্ত করার প্রয়োজন যেমন রয়েছে, তেমনই হকারদের জীবিকার অধিকারও অস্বীকার করা যায় না। তাই “সম্পূর্ণ উচ্ছেদ” নয়, বরং “পরিকল্পিত হকার ব্যবস্থাপনা” বেশি কার্যকর সমাধান হতে পারে।

প্রশাসন চাইলে ফুটপাতের একটি নির্দিষ্ট অংশ পথচারীদের জন্য খালি রেখে বাকি অংশে নির্দিষ্ট vending zone তৈরি করতে পারে। প্রত্যেক হকারের survey ও registration করা, নির্দিষ্ট সময় ও জায়গা বরাদ্দ করা, অগ্নিনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি মানানো এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কাছাকাছি বিকল্প বাজারে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে নাগরিকদের চলাচলের অধিকার এবং হকারদের জীবিকা—দুই দিকই রক্ষা করা সম্ভব।

লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের হকার উচ্ছেদ অভিযানকে এক কথায় সম্পূর্ণ ভালো বা সম্পূর্ণ খারাপ বলা যায় না। অবৈধ দখল সরিয়ে ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করা, যানজট কমানো এবং শহরের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ ইতিবাচক। কিন্তু অন্যদিকে, পুনর্বাসন ছাড়া ব্যাপক উচ্ছেদ করলে দরিদ্র ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তাই একটি মানবিক ও আইনসম্মত নীতিই সবচেয়ে প্রয়োজনীয়—“ফুটপাত থাকবে পথচারীর জন্য, আর হকারদের জন্য থাকবে নির্দিষ্ট ও নিরাপদ জায়গা।” উন্নত শহর গড়ার সঙ্গে মানুষের জীবিকাকেও সুরক্ষিত রাখতে পারলেই এই উচ্ছেদ অভিযান সত্যিকার অর্থে সফল হবে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ঘনিষ্ঠতা, নজরে নয়াদিল্লি

বিধানসভা থেকে বই ফেরত না দিলে মমতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা: গ্রন্থাগারমন্ত্রী

সীমান্তে পৌঁছনোর আগেই পুলিশের জালে পাচারকারী! গাড়ি থেকে উদ্ধার ১২০০ শিশি ফেন্সিডিল