নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান: নিখোঁজ ১০৫ ভারতীয়, উদ্ধারকাজে তৎপর ভারত

কাঠমান্ডু, ২৬ আগস্ট: নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ হড়পা বানে কার্যত বিপর্যস্ত রাসুয়া-সহ বিস্তীর্ণ এলাকা। বুধবার সকালে আচমকা প্রবল জলস্রোত ভাসিয়ে দেয় রাস্তা, সেতু, বাড়িঘর ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো। ভোতে কোশি নদীর জলস্তর হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাসুয়া জেলার রাসুওয়াগাধি ও তার আশপাশের এলাকা।

প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়ে লেন্দে খোলা নদীতে আকস্মিক জলপ্রবাহ তৈরি হয়। সেই জল ভোতে কোশি নদীতে নেমে এসে ভয়াবহ হড়পা বানের সৃষ্টি করে। নেপালের জল ও আবহাওয়া দফতরের বক্তব্য অনুযায়ী, রাসুয়ায় ওই সময় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। ফলে শুধুমাত্র বৃষ্টির কারণে এই বন্যা হয়েছে—এমনটা মনে করা হচ্ছে না।

বিপর্যস্ত যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ পরিষেবা


হড়পা বানের স্রোতে একাধিক সেতু ও রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথেও এর প্রভাব পড়েছে। একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে। রাসুয়া ও আশপাশের এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং টেলিযোগাযোগ পরিষেবারও ক্ষতি হয়েছে।

নেপালের সেনা, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী উদ্ধার ও ত্রাণকাজে নেমেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রাস্তা ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজ যথেষ্ট কঠিন হয়ে পড়েছে। নিখোঁজ ও আটকে পড়া মানুষদের খুঁজে বের করতে হেলিকপ্টার ও অন্যান্য উদ্ধারকারী ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিপাকে ভারতীয় তীর্থযাত্রীরা

এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ভারতীয় নাগরিকদের নিয়ে। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের প্রাথমিক তালিকা অনুযায়ী, রাসুয়ার বন্যার পর ৩৮৪ জন যাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাঁদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয় নাগরিক এবং আরও ৩৭ জন এনআরআই রয়েছেন। তালিকাটি এখনও যাচাই করা হচ্ছে, তাই নিখোঁজের সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।

নিখোঁজ ভারতীয়দের একটা বড় অংশ কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় যাচ্ছিলেন। সীমান্তের কাছে রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় তাঁদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে নিখোঁজ মানেই মৃত্যু নয়—প্রশাসন ও পর্যটন সংস্থাগুলি তাঁদের অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

ভারত সরকারের তৎপরতা

পরিস্থিতির পর নেপালের ভারতীয় দূতাবাস সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ভারতীয় নাগরিকদের দ্রুত উদ্ধার ও নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করছে। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকও নেপাল সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করছে। নেপাল সরকারও উদ্ধার ও ত্রাণকাজে ভারতের সহযোগিতা চেয়েছে।

এদিকে ভারতের বিহার ও উত্তরপ্রদেশেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নেপাল থেকে নেমে আসা নদীগুলির জলস্তর বাড়ার সম্ভাবনায় সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশের মহারাজগঞ্জ ও কুশীনগর এবং বিহারের সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ফের হড়পা বানের আশঙ্কা

বিপদ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। লেন্দে খোলা নদীর উজানে জলপ্রবাহে বাধা তৈরি হওয়ায় সেখানে জল জমে রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সেই জল হঠাৎ নেমে এলে ফের ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ জায়গায় থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

নেপালের এই বিপর্যয় শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, ভারত-নেপাল সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা এবং দুই দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উপরও বড় প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় থাকা ভারতীয়দের নিরাপদে উদ্ধার করাই এখন ভারত ও নেপাল—দুই দেশের কাছেই অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ঘনিষ্ঠতা, নজরে নয়াদিল্লি

বিধানসভা থেকে বই ফেরত না দিলে মমতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা: গ্রন্থাগারমন্ত্রী

সীমান্তে পৌঁছনোর আগেই পুলিশের জালে পাচারকারী! গাড়ি থেকে উদ্ধার ১২০০ শিশি ফেন্সিডিল